Menu

বঙ্গবন্ধুর প্রধানমন্ত্রিত্ব, রাষ্ট্রপতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই : খায়রুল হক

  • Print
এ বি এম খায়রুল হক বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি। বর্তমানে বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যান। ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান, পরের বছর ১৭ মে তিনি অবসরে যান। এ বি এম খায়রুল হক ১৯৪৪ সালে মাদারীপুরের রাজৈর থানার আড়াইপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক, লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ১৯৭৫ সালে বার-অ্যাট-ল' ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে হাইকোর্ট বিভাগে ও ১৯৮২ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৯৮ সালে হাইকোর্টের অস্থায়ী বিচারপতি ও ২০০০ সালের এপ্রিলে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। হাইকোর্টে বিচারপতি থাকাকালে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, পঞ্চম সংশোধনী মামলা ও আপিল বিভাগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মামলার রায়সহ বহু অলোচিত রায় দিয়েছেন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রেজাউল করিম
কালের কণ্ঠ : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেছিলেন- এ বিষয়টি নিয়ে একটি মহল বিতর্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?
খায়রুল হক : এ প্রশ্নের মধ্যে দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো পলিটিক্যাল, আর একটি হলো আইনগত। একটি আরেকটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটি চিন্তা করা যায় না। প্রশ্নে আপনি যে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ নিয়ে কথা বলেছেন শুধু এই এক দিন হিসাব করলে আপনার প্রশ্নের আইনগত দিক বা পলিটিক্যাল দিক কোনোটাই বোঝা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ ও এর আইনি দিক বুঝতে হলে প্রথমেই বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস অবশ্যই জানতে হবে।
অনেক বছর ধরেই এই উপমহাদেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। ব্রিটিশরা ১৯৪৬ সালের দিকে মোটামুটি রাজি হলো ভারত উপমহাদেশকে স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য। কিভাবে দেবে, কখন দেবে তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। এ সময় ১৯৪৬ সালে নির্বাচন হলো। এই নির্বাচনে মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির ওপরই নির্বাচনটা হলো। উপমহাদেশে একমাত্র বঙ্গ প্রদেশ মুসলিম লীগ ১১৯টির মধ্যে ১১৬টি আসনে জয়লাভ করে ভূমিধস বিজয় লাভ করে। সিন্ধু প্রদেশে খুব সামান্য ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো রকমে লাভ করে। আর কোনো প্রদেশে মুসলিম লীগ জয়লাভ করতে পারেনি। সেদিক দিয়ে বলা যায় যে বাঙালি তাদের ভোটের অধিকার দিয়ে পাকিস্তান অর্জন করে, পাঞ্জাবি, বালুচ বা পাঠানরা নয়। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির সাত মাসের মাথায় ভাষার প্রশ্নে বাঙালি প্রথম ধাক্কা খেল। আমাদের মাতৃভাষা কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হলো। তা ছাড়া রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাঙালিকে চরমভাবে বঞ্চনা করা আরম্ভ হলো। বাঙালি আশায় ছিল যে ১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানে নির্বাচন হবে, কিন্তু ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসেই মার্শাল ল জারি হলো, তখনকার পূর্ব বাংলায় চরম নিষ্পেষণ আরম্ভ হলো। পাকিস্তানে চিরকালের জন্য গণতন্ত্র হারিয়ে গেল।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হলেন। তিনি তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করলেন। পরবর্তীকালে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। সে সময় তিনি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ছয় দফার পক্ষে বক্তব্য প্রদানের জন্য হুলিয়া মাথায় নিয়ে চষে বেড়িয়েছেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল আমরা যাতে শোষণমুক্ত জীবন যাপন করতে পারি। সে জন্যই এই ছয় দফার পক্ষে জনমত গড়ার জন্য সারা পূর্ব পাকিস্তান নিরলসভাবে চষে বেড়িয়েছেন। তাঁকে আগরতলা মামলায় জড়ানো হলো। জনরোষের মুখে পাকিস্তান সরকার আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হলো।
১৯৬৯ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি জনসভায় বঙ্গবন্ধু প্রথম প্রস্তাব করেন পূর্ব পাকিস্তানকে 'বঙ্গপ্রদেশ' হিসেবে অভিহিত করতে। ১৯৭০ সালে নির্বাচন শেষ হলো। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০টিই আওয়ামী লীগ লাভ করে এবং প্রাদেশিক নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে সম্ভবত ২৮৭টি আসন লাভ করে। প্রাচীন রাজা-মহারাজা, বাদশাহ-সুলতানরা নিজেদের শক্তিবলে দেশ শাসন করতেন। কিন্তু প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রে জনগণই তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধির মারফতই জনগণ তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন ও ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর রাজনৈতিক দলকে নিরঙ্কুশ সমর্থন প্রদান করে তাঁকে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের মুখপাত্র নির্বাচিত করে। প্রকৃতপক্ষে তিনিই হলেন একমাত্র বৈধ মুখপাত্র।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ বেলা ১টার সময় হঠাৎ করেই ৩ মার্চে নির্ধারিত জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হলো। সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালি রাজপথে বেরিয়ে এলো। স্টেডিয়ামের খেলা বন্ধ হয়ে গেল। ওই দিন বিকেলেই আওয়ামী লীগের সব এমএনএ ও এমপিএ একযোগে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করেন। সেই ক্ষমতা বলেই বঙ্গবন্ধু জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বাঙালিদের নির্বাচিত মুখপাত্র হিসেবে সংলাপ করেন। অন্য কেউ নন। এরই মধ্যে ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা করলেন। ৭ মার্চ তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ, যেটাকে মনে করি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ। ৭ মার্চ থেকেই বাংলাদেশের সব প্রশাসনিক, অফিশিয়াল ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই চলতে থাকল। ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু সম্ভবত ৩৮টি নির্দেশনা দিয়েছিলেন, যার বলে দেশে প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানসমূহ তাঁর নির্দেশনা অনুসারেই পরিচালন আরম্ভ হয়। ওই নির্দেশনাসমূহ অনুসারেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছিল।
কালের কণ্ঠ : কে প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করেন?
খায়রুল হক : ২৫ মার্চ দিবাগত রাতেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আমরা ২৭ তারিখে ভোরে 'লন্ডন টাইমস' পত্রিকায় দেখি যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লিংকনস ইনে গিয়ে গার্ডিয়ানসহ অন্যান্য খবরের কাগজেও দেখলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। পরবর্তীকালে আমি দেখেছি, আসলে ২৬ তারিখ রাতেই এই ঘোষণার খবরটি বিবিসিতে প্রচার করা হয়েছিল।
এই ঘোষণা তিনিই দেবেন- এটাই ছিল স্বাভাবিক কারণ। প্রথমত, তিনি নিজে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি; দ্বিতীয়ত, তাঁর নেতৃত্বেই তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের মোট ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন ও শুধু তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদেও ২৮৭টি আসন লাভ করে বাঙালি জাতির প্রতিনিধি ও মুখপাত্রে পরিণত হন। তা ছাড়া তাঁর নেতৃত্বেই 'বেঙ্গলি ন্যাশনালিজম'-এর সৃষ্টি।
কালের কণ্ঠ : প্রশ্ন তোলা হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে?
খায়রুল হক : আপনাদের এখন চিন্তা করতে হবে একাত্তরের প্রারম্ভ থেকে ওই সময় পর্যন্ত কী পরিস্থিতি ছিল। মার্চ মাসে বাংলাদেশ তথা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা কী ছিল। ওই সময় বাংলার মানুষ কাকে চিনত? নিজেকে প্রশ্ন করুন, কার অঙ্গুলি হেলনে তখন সমগ্র বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছিল? সেই মার্চ মাসে সমগ্র পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশের একটি মানুষ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে আর পাকিস্তানের জেনারেল ইয়াহিয়া ও ভুট্টোকে চিনত। আর কাউকে চিনত বলে আমার মনে হয় না। হ্যাঁ, বঙ্গবন্ধুর পরে যদি আমরা কারো কথা চিন্তা করে থাকি তিনি হলেন তাজউদ্দীন আহমদ।
কালের কণ্ঠ : বঙ্গবন্ধুর অবস্থান কী ছিল?
খায়রুল হক : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এ দেশের মানুষ চল্লিশের দশকের শেষদিকে চেনে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে, ষাটের দশকে একজন উদীয়মান নেতা হিসেবে, সত্তরের দশকের প্রারম্ভে বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা ও স্টেটসম্যান হিসেবে। আবালবৃদ্ধবনিতার কাছে তাঁরই গ্রহণযোগ্যতা ছিল। এটাই ছিল ২৫ মার্চের বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থান, রাজনৈতিক বাস্তবতা।
কালের কণ্ঠ : জিয়াউর রহমান কখন আলোচনায় এলেন?
খায়রুল হক : ২৯ বা ৩০ মার্চ আমি লন্ডনে শুনলাম, পাকিস্তান আর্মির একজন বাঙালি মেজর স্বাধীনতার কথা বলেছেন। এই বিষয়টি আমাদের কাছে খুব একটা অস্বাভাবিক লাগেনি। এটা প্রত্যাশিত ছিল। ২৫ তারিখ দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পরই ৭ মার্চে তাঁর যে নির্দেশনা ছিল, সেই নির্দেশনার ভিত্তিতে সব বাঙালি স্বাধীনতার পক্ষে চলে যাবে- এটাই স্বাভাবিক ছিল। আমরা যারা তখন লন্ডনে ছিলাম, তারাও রাতারাতি পাকিস্তানি থেকে বাংলাদেশি হয়ে গেছি। বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। বিভিন্ন দূতাবাসে কর্তব্যরত বাঙালিরাও স্বাধীনতার পক্ষে চলে আসা শুরু করেছেন। এই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্তব্যরত বাঙালি অফিসাররা স্বাধীনতার পক্ষে চলে আসবেন, তাতে কোনো নতুনত্ব আমাদের কাছে মনে হয়নি। বরং এটাই স্বাভাবিক ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে যখন ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেছিলেন, তখন থেকেই তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠা শুরু করেছিল। তাঁর যে আন্দোলন সেটিও প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর দাবি গণদাবিতে রূপান্তরিত হতে থাকে। ওই সময় তিনি বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হন এবং অবিস্মরণীয় নেতা হিসেবে বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নেন। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় তাঁকে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করার রাজনৈতিক অধিকার ও ক্ষমতা প্রদান করে, যা তখনই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়। অন্য কেউ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে তা বালখিল্যতা হতো। প্রকৃতপক্ষে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া অন্য কেউ স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারেন- এটি কারো মাথায়ই প্রবেশ করেনি।
কালের কণ্ঠ : কোন আইনের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়?
খায়রুল হক : ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের নির্বাচিত গণপরিষদের পক্ষে একটি ফরমাল প্রোক্লেমেশন অব ইনডিপেনডেন্স জারি হয়। যেহেতু বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে এই প্রোক্লেমেশনটি দেওয়া হয়েছিল, সে জন্যই এটির একটি শক্তিশালী পলিটিক্যাল ও লিগ্যাল ভিত্তি রয়েছে। প্রোক্লেমেশন অব ইনডিপেনডেন্সই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক দলিল। এর অপরিসীম সাংবিধানিক মূল্য রয়েছে।
উল্লেখ্য, আমেরিকার ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স কিন্তু কোনো একক ব্যক্তি দেননি। যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার প্রায় এক বছর পর এটা ড্রাফ্ট করতে দেওয়া হয়েছিল পাঁচজনের এক কমিটিকে। তাঁর একজন ছিলেন থমাস জেফারসন। তাঁরা যে ড্রাফ্টটি করেছিলেন, সেটা পেশ করেন আমেরিকান সেকেন্ড কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসে। কংগ্রেস এটিকে সংশোধন ও মডিফিকেশন করার পর ৪ জুলাই ১৭৭৬ তারিখে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ঘোষণাটি দেওয়া হয়। ১৭৮১ সালে ব্রিটিশ সেনাপতি লর্ড কর্নওয়ালিশের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। তারা ১৭৮৭ সালে তাদের সংবিধান প্রণয়ন করে। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের প্রোক্লেমেশনের ওপর ভিত্তি করেই প্রবাসী সরকার গঠিত হয় এবং তাদের নির্দেশ অনুসারেই স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালিত হতে থাকে।
কালের কণ্ঠ : স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে প্রবেশ করেন, এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য?
খায়রুল হক : আপনাদের বুঝতে হবে যে সে সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের টহপৎড়হিবফ করহম, তাঁর কথাই ছিল আইন। তা সত্ত্বেও সাংবিধানিক সব আইনি পদক্ষেপ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিপালন করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে যখন বাংলাদেশ থেকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তখনো তাঁর সঙ্গে কোনো পাসপোর্ট ছিল বলে শোনা যায় না। আর পাকিস্তান থেকে যখন তিনি লন্ডন বিমানবন্দরে নামেন, তখনো তাঁর কোনো পাসপোর্ট ছিল বলে শোনা যায়নি। ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের বিশেষ বিমানে তিনি যখন ভারত হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তখনো তাঁর কোনো পাসপোর্টের প্রয়োজনীয়তা কেউই উপলব্ধি করেনি। কারণ সারা পৃথিবী তাঁকে অভিনন্দিত করেছে বাংলাদেশের মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে। তাই পাসপোর্টের কথা কারো মনেই আসেনি। কোনো কাস্টমস্ চেকিংও হয়নি, কোনো ইমিগ্রেশন চেকিংও হয়নি।
কালের কণ্ঠ : দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন...
খায়রুল হক : বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরলে ১১ জানুয়ারি প্রভিশনাল কনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ অর্ডার ১৯৭২ জারি করা হয়। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে জারি করা প্রোক্লেমেশন অব ইনডিপেনডেন্সের ভিত্তিতে ওই প্রভিশনাল কনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ অর্ডার জারি করা হয়। এই অর্ডারের ক্ষমতাবলেই পরবর্তী ১০-১১ মাস বাংলাদেশ শাসন করা হয়। ওই সময় প্রায় শখানেক প্রেসিডেন্টস অর্ডার ইস্যু করা হয়। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তিনি এই শপথ নেন প্রভিশনাল কনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ অর্ডার ১৯৭২-এর বিধান অনুসারে। এর বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগই নেই। আমার কাছে খুব আশ্চর্য লাগে যে ওই সময় ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম প্রমুখ একেবারেই যুবক ছিলেন। অন্য নেতারাও ৫০-এর মধ্যেই ছিলেন। তা সত্ত্বেও তখন যে সব সাংবিধানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ আইনানুগ ও বৈধ। তাঁদের কোনো পদক্ষেপের মধ্যে সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে কোনো ভুল বা ভ্রান্তি আমি দেখি না।
কালের কণ্ঠ : একটি মহল এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে...
খায়রুল হক : ১৯৭৩ সালে জনৈক এ কে এম ফজলুল হক দালাল আইন চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট মামলা করেছিলেন। ১৯৭৩ সালে সেই রিট মামলা হাইকোর্ট বাতিল করলে সে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করেন ফজলুল হক। সেটার শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি সায়েম ও বিচারপতি মাহমুদ হোসেইনের সমন্বয়ে আপিল বিভাগের বেঞ্চ সিদ্ধান্ত প্রদান করেন যে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের প্রোক্লেমেশনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে। সে ক্ষমতা বলেই প্রভিশনাল কনস্টিটিউশন অর্ডার প্রণয়ন করা হয় এবং ওই প্রভিশনাল অর্ডারের ক্ষমতাবলেই বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। মামলাটি ২৬ ডিএলআর, এসসি ১৯৭৪ পৃষ্ঠা ১১তে উল্লেখ রয়েছে।
তা ছাড়া আমাদের মূল সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে এই সংবিধানের অন্য কোনো বিধান থাকা সত্ত্বেও চতুর্থ তফসিলে বর্ণিত বিধানাবলি ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি হিসেবে কার্যকর হবে। আর্টিকেল ১৫০-এর আওতায় চতুর্থ তফসিলের তৃতীয় দফায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে এই সংবিধান প্রবর্তনের তারিখের মধ্যে প্রণীত বা প্রণীত বলে বিবেচিত সব আইন ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ইত্যাদি আইনানুযায়ী যথার্থভাবে প্রণীত, প্রযুক্ত ও কৃত হয়েছে বলে ঘোষিত হয়েছে।
কালের কণ্ঠ : আপনাকে ধন্যবাদ।
খায়রুল হক : আপনাকেও ধন্যবান।
উৎসঃ   কালের কন্ঠ
back to top
United Kingdom Bookmaker CBETTING claim Coral Bonus from link.

প্রধান সম্পাদকঃ  তাজ চৌধুরী                          সম্পাদকঃ  মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানাঃ  ২২০ জুবিলি স্ট্রিট, লন্ডন ই১ ৩বিএস, যুক্তরাজ্য
ফোনঃ  ০২০৮৫২৩৫৯৯৯,  ০৭৯৫১৪৫২৭৩৬
ইমেইলঃ  admin@chobbishghanta.com